তাজরীন গার্মেন্টসে শ্রমিকদের গণহত্যাকাণ্ড সম্পর্কে

পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির বিবৃতি

আমরা শোকাহত এবং আমরা বিক্ষুব্দ।

বড় ধনীদের অতি মুনাফার লোভই এই গণহত্যার কারণ।

(সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কমিটিপূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির  মাওবাদী বলশেভিক পুনর্গঠন আন্দোলন  কর্তৃক  প্রকাশিত ও প্রচারিত।  ডিসেম্বর, ১মসপ্তাহ,’১২)

গত ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক পোশাক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিল গরিব পরিবার থেকে আসা নারী শ্রমিক।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল এমন শ্রমিকদের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিকদেরকে বিভিন্ন ফ্লোরে তালা মেরে রাখার জন্যই তারা বের হতে পারেনি, ফলে অগ্নিদগ্ধ হয়ে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তাই এটি এড়ানো সম্ভব নয় এমন ধরনের আকস্মিক দূর্ঘটনা নয়; বরং এটি হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড।

প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ী আগুন লাগার বিষয়টি জানতে পেরে তারা কারখানা থেকে বের হবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মালিকপক্ষের লোকজন শ্রমিকদেরকে বের হতে দেয়নি। ফলে এ হচ্ছে মালিকপক্ষ থেকে সংঘটিত গণহত্যা।

আমাদের দেশের গার্মেন্টস শিল্পগুলোতে হর-হামেশাই এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটছে এবং শ্রমিকদেরকে বের হতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতিবছরই গার্মেন্টস শিল্পে অনেক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

আমাদের দেশের গার্মেন্টস শিল্পগুলো হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর পরনির্ভরশীল অর্থনীতির মূর্ত প্রতীক। সাম্রাজ্যবাদীদের বর্ধিত মুনাফার স্বার্থেই এদেশের সস্তা শ্রমশক্তি লুন্ঠনের উদ্দেশ্যে এদেশী দালাদের সাহায্যে তারা আমাদের মতো দেশে গার্মেন্টস শিল্প গড়ে তুলেছে। এখানে কম দামে পোশাক বানিয়ে অন্যত্র উচ্চদামে বিক্রি করে মুনাফা অর্জনই তাদের লক্ষ্য। বিদেশী বড় ধনীদের এ লক্ষ্য অর্জন সহায়তা করে এদেশীয় বড় ধনীরা মুনাফার একটি হিস্যা বা অংশ পায়। ফলে পোশাক উৎপাদনে যত কম খরচ হয় ততই তাদের মুনাফা বৃদ্ধি পায়। এ কারণে উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত অতি প্রয়োজনীয় নয় এমন খাতগুলোতে অর্থ ব্যয়ে তারা কার্পণ্য করে। তারা উৎপাদন উপকরণের যন্ত্রপাতির অংশগুলোকে অতি প্রয়োজনীয় মনে করে। ফলে এসবের আমদানী ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ করে। কিন্তু তারা উৎপাদন উপকরণের অতি অপরিহার্য উপাদান মানুষকে অতি প্রয়োজনীয় বলে মনে করে না। ফলে তাদের মজুরী, তাদের স্বাস্থ্য ও তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে তারা মনোযোগ দিতে এবং অর্থ ব্যয় করতে অনিচ্ছুক হয়।

একারণেই আমাদের দেশের একটি গার্মেন্টেসেও শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরী, চিকিৎসা সেবা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। যদিও কথার ফুলঝুড়ি ছুটিয়ে মালিকপক্ষ সর্বদা দাবী করে যে, তাদের গার্মেন্টসগুলো আধুনিক “কমপ্লায়েন্ট”। তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসের মালিকপক্ষও তেমনই দাবী করেছে।

কিন্তু জানা যায়, অন্যান্য গার্মেন্টেসের মতো তাজরীন গার্মেন্টসেও আকস্মিক দূর্ঘটনা প্রতিরোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না। যেমন তাজরীন গার্মেন্টসে তিনটি সিঁড়ি আছে বলে দাবী করা হয়। কিন্তু প্রতিটি সিঁড়ি নীচলায় যে কক্ষে গিয়ে মিলেছে সেখানেই গুদাম ঘর বানানো হয়েছে। সেখানে সিনথেটিক জাতীয় সুতা, কাপড় প্রভৃতি ধরনের দাহ্য পদার্থের সাথে পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থের মতো অতি দাহ্য পদার্থ ছিল। ফলে এখানেই আগুনের তাপ বেশি ছিল এবং এ সিঁড়িগুলো ব্যবহারের অনুপযুক্ত ছিল। আহত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হবার এটি একটি কারণ ছিল। পৃথক গুদাম করা হলে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মুনাফা কমে যাবে- এ চিন্তা থেকেই মালিকপক্ষ সিঁড়ির জন্য ব্যবহৃত স্থানকে গুদাম বানিয়েছিল। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, মালিকপক্ষের অধিক মুনাফার লোভই এই গণহত্যার প্রকৃত কারণ।

অন্যান্য গার্মেন্টসের অবস্থাও তাজরীন ফ্যাশনসের মতোই। সকল গার্মেন্টসই দেশীয় অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। এগুলো বিদেশী পুঁজি, যন্ত্রাংশ, কাচামাল ও প্রযুক্তি নির্ভর। এগুলোর বাজারও বিদেশে। এগুলোর মূল নিয়ন্ত্রক সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দেশের বড় ধনীদের বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট,টার্গেট,এইচএন্ডএম, পিভিএইচ, জেসিপেন,গ্যাপ,ফিয়ারস,কোহল প্রভৃতির মতো নামিদামি ব্র্যান্ডের পোষাক বিক্রেতারা। এরা নিজেদের মুনাফার ছিঁটাফোঁটা বিলায় এবং তা পাওয়ার জন্য এদেশের বড় ধনীরা তাদের দালালী করে। ফলে স্বনির্ভর অর্থনীতি, স্বনির্ভর শিল্প, নিজ দেশেই উৎপন্ন পণ্যের চাহিদা ও বাজার সৃষ্টি প্রভৃতি সুদূর প্রসারী হিতকর ব্যবসায়ীক উদ্দ্যোগ নেয়া থেকে তারা বিরত থাকে। যেন-তেন প্রকারে মুনাফার কিছু হিস্যা পাওয়ার জন্য তারা মুখিয়ে থাকে। এরফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ, জাতি ও  জনগণ।

প্রধানত গার্মেন্টস শিল্পের উপর নির্ভর করে এবং প্রবাসীদের আয়ের উপর ভিত্তি করে বড় ধনীদের স্বার্থরক্ষক সরকার, তাদের পোষ্য রাজনৈতিক দলসমূহ ও বুদ্ধিজীবীরা দেশের প্রবৃদ্ধির ভূয়া হিসাব করে এবং শনৈ শনৈ উন্নতির জিগীর করে। যদি আমেরিকা বা এধরনের অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদীরা গার্মেন্টস শিল্পের উপর খড়গহস্ত হয়, তাদের দেশে প্রবাসীদের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে, তবে আমাদের উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির বেলুন তো নিমেষেই চুপসে যাবে।

নিজের শক্তিতে নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে ও হাঁটতে পারাই হচ্ছে স্বনির্ভরতা। আর অপরের উপর ভর করে দাঁড়ানো ও হাঁটা হচ্ছে পরনির্ভরতা। আমাদের পরনির্ভরতা কাটানো ও স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে বড় বাঁধা হচ্ছে এই গার্মেন্টস মালিকদের মতো আমলা মুৎসুদ্দী বুর্জোয়ারা, তাদের নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদীরা। সুতরাং তাদের উৎখাতের মধ্য দিয়ে গণকল্যাণমূলক, শ্রমিক-কৃষক বান্ধব রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

আসুন, আমরা তাই করি। উৎপাদন ব্যবস্থায় “সামাজিক উৎপাদন ও ব্যক্তি মালিকানা”র বৈপরীত্যের ও অস্বাভাবিকত্বের অবসান ঘটিয়ে “সামাজিক উৎপাদান ও সামাজিক মালিকানা” প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হই। এবং এভাবেই তাজরীন গার্মেন্টসসহ অন্যান্য গার্মেন্টস ও মিল-কারখানায় শহীদ সকল শ্রমিকদের প্রতি আমাদর ভালবাসা ও একাত্মতা প্রকাশ করি।

তাজরীন গার্মেন্টসের শহীদ শ্রমিকদের পরিবারবর্গের প্রতি জানাচ্ছি আমাদের হৃদয়ের গভীরতম শোক ও সমবেদনা। এবং একই সাথে জানাচ্ছি, শোকের মাতম ওইসব বড় ধনীদের বুকে একটু দয়াও উৎপন্ন করবে না। কেননা, ওরা খুনী। ওদের কৃপা ভিক্ষা নয়; ওদেরকে চিরতরে উৎখাত করতে হবে।

( মানব রহমান )
     মুখপাত্র
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি ( মাওবাদী বলশেভিক পুনর্গঠন আন্দোলন – MBRM)

Tags: , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: