চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির বিবৃতি

আওয়ামী-বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার লড়াইয়ে

জনগণের জীবন অতিষ্ঠ। তারা শান্তি চায়, তারা বাঁচতে চায়।

আশাহীন অন্ধকারের পরিবর্তে জনগণ আলোকিত ভবিষ্যৎ চায়।

 (সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কমিটি. PBSP (MBRM) কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত। ২য় সপ্তাহ, মার্চ’১৩)

সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ-আধিপত্যবাদ নির্ভর মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের দল আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ক্ষমতার হালুয়া-রুটির বড় ভাগ পাবার লড়াই তীব্র হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগর ভিত্তিক অঞ্চলে মার্কিন-ভারত নাকি মার্কিন-পাকিস্থান (মধ্যপ্রাচ্যসহ তুরস্ক-মালয়শিয়া)র আধিপত্য থাকবে/প্রতিষ্ঠিত হবে তা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতার অংশ হিসেবে এদেশেও তাদের পক্ষভুক্ত স্বার্থরক্ষক দলগুলো পরস্পর মরণপণ কামড়া-কামড়িতে লিপ্ত হয়েছে। নিজেদের কোটারী স্বার্থে তারা রাজনীতিগত, ধর্মগত ও নাস্তিকতা-আস্তিকতার বিশ্বাসগত পার্থক্যকে উস্কে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করছে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধাচ্ছে। এভাবে জনগণকে বিভক্ত ও নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জনগণ। জনগণের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দৈনন্দিন জীবনে বন্ধাত্য নেমে এসেছে। প্রতিদিন জীবন ঝরছে, আগুন জ্বলছে, সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। জনগণের জীবন আটকে পড়েছে এক অন্ধকার আশাহীন ভবিষ্যতের ফাঁদে। এর থেকে জনগণ বেরিয়ে আসতে চায়, জনগণ মুক্তি চায়, আলোকিত ভবিষ্যৎ চায়।

মার্কিন-পাকিস্তান (মধ্যপ্রাচ্যসহ তুরস্ক-মালয়শিয়া) পন্থী জামায়াত-বিএনপি এবং মার্কিন-রুশ-ভারত পন্থী আওয়ামীলীগ আর উভয়পক্ষের দোসররা, ভারত মহাসাগর ভিত্তিক অঞ্চল নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী-আধিপত্যবাদী পলিসি এবং নিজেদের কুৎসিত ক্ষমতার মোহ ও লুটেরা লোভকে ধামাচাপা দিতে. জনকল্যাণের ধূয়া তুলছে । প্রকৃত সত্য হচ্ছে, জনগণকে কে বেশি বেশি লুটপাট করার সুযোগ পাবে, তা নিয়ে তাদের ও তাদের মধ্যদিয়ে তাদের প্রভুদের মধ্যে কামড়াকামড়ি চলছে। এর মধ্যে “জনকল্যাণ ও জনস্বার্থ” বলে কিছু নেই।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে এদেশে কোন পক্ষের স্বার্থরক্ষকরা আগামীদিনে ক্ষমতায় থাকবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে। একারণেই “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে” নাকি “দলীয় সরকারের অধীনে” আগামী নির্বাচন হবে- এই বিতকর্কে সামনে আনা হয়েছে। বিএনপি মনে করছে, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের” অধীনে নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতার বড় ভাগ পেতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে আওয়ামীলীগ ভাবছে, “দলীয় সরকারের” অধীনে নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতার বড় ভাগ পাবে। আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জামায়াত লবীগুলোর দোসরদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বখরা নিয়ে কামড়াকামড়ি নতুন কিছু নয়। এর সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও ভিত্তি রয়েছে। প্রত্যেকেই ঐতিহাসিক সত্যসমূহকে, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে ধামাচাপা দিয়ে মনগড়া তথাকথিত সত্য উত্থাপনের মাধ্যমে ইতিহাসকে বিকৃত করেছে, ভূয়া ইতিহাস রচনা করেছে এবং তাকেই প্রকৃত সত্য বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। এবং এভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করেছে। এবং জনগণকে তাদের লুটেরা স্বার্থের বলির পাঠা বানাচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী ছিল এক সময়ে আওয়ামীলীগেরই দাবী, তা আদায়ের জন্য সেই সময়ে আওয়ামীলীগ জনগণকে জিম্মি করে এক মহা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। এসময়ে তাদের সহযোগি ছিল জামায়াত। এর বিরোধী ছিল বিএনপি। আওয়ামীলীগের দাবি আদায়ের ফল ফলশ্রুতিতে তারা ক্ষমতায়ও এসেছিল। পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে অনেকাংশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের চেষ্ঠা করলে তা মানতে অস্বীকার করে আওয়ামীলীগ। এর ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যার ধারাবাহিকতায় মূলত সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসে। যাকে আওয়ামীলীগ তার আন্দোলনের ফসল বলে দাবী করে। এই সামরিক শাসকবর্গের ছত্রছায়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পূর্বনির্ধারিত আপোষরফা অনুযায়ী আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে এবং দুর্নীতি, লুটপাট, নির্যাতন, হত্যা, গুম প্রভৃতির অবাধ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এবং ক্ষমতার মসনদকে চিরস্থায়ী করার জন্য একসময়ে নিজেদেরই দাবীকৃত “তত্তবধায়ক সরকার” এর বদলে “দলীয় সরকারের” অধীনে নির্বাচনের আইন জারী করে। স্বভাবতই একে মানতে অস্বীকার করে বিএনপি ও তার মিত্ররা। এবং একসময়ে তাদেরই বিরোধীতাকৃত “তত্ত্বাবধায়ক” সরকারের দাবীতে ‘আন্দোলন’ শুরু করে। অর্থাৎ, তারা ইতোপূর্বে আওয়ামীলীগের দেখানো পথেই হাঁটছিল। কিন্তু কৌশলী রাজনীতিতে অনেক দক্ষ ও পরিপক্ক আওয়ামীলীগ সহজে বিএনপিকে বিজয়ী হতে দিতে রাজী ছিল না, তাই সে “জামায়াত কার্ড” খেলা শুরু করল।

জামায়াত সংগঠন হিসেবেই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি ছিল। তারা পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর দোসর ছিল। কাজেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই তারা কখনো আওয়ামীলীগ, আবার কখনো বিএনপির ছত্রছায়ায় থেকে রাজনীতি করছে। আওয়ামীলীগ ও বিএনপিই জামায়াতকে টিকিয়ে রাখছে এবং সুবিধা অনুযায়ী “জামায়াত কার্ড” খেলছে। বর্তমানে বিএনপিকে একঘরে করার জন্য, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আসতে বাধ্য করার জন্য আওয়ামী লীগ “জামায়াত কার্ড” খেলা শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুকে সামনে এনেছে। এর লক্ষ্য চাপে ফেলে জামায়াতকে বিএনপি শিবির থেকে সরানো, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আসতে বাধ্য করা, এভাবে আওয়ামীলীগের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা। এ উদ্দেশ্যে কিছু কিছু নেতাকে সাজা দিয়ে, পরে সাজা মওকুফের সুযোগ রেখে একটা তথাকথিত বিচারের লোক দেখানো আয়োজনও করে সরকার। একইসাথে জামায়াতকে সেসময়ে মিটিং মিছিল করার অবাধ সুযোগ সুবিধা দেয়, তাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য পুলিশী পাহাড়ার ব্যবস্থা করে এবং এমনকি পুলিশের সাথে রজনীগন্ধ্যা বিনিময়ের ব্যবস্থা করে। এসবের প্রতি বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা আরবান মধ্যবিত্ত জনগণের প্রতিবাদী বিস্ফোরণ হিসেবে সৃষ্টি হয় শাহবাগ।

শাহবাগ আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল আওয়ামীলীগ সরকারের প্রতি অনাস্থা ও ক্ষোভ থেকে। কিন্তু অসংগঠিত আন্দোলন বড় দলগুলোর কামাড়াকামড়ি ও পরস্পর বিরোধীতার মধ্যে পড়ে ক্রমান্বয়ে ও ক্রমবর্ধিতহারে হারে খেই হারাচ্ছে। আন্দোলনকে গণমুখী ও গণসম্পৃক্ত করার জন্য ব্যাপক সংখ্যক জনগণের মৌলিক দাবী ও কর্মসূচী বিষয়ে তারা কিছু বলছে না, সেসবকে তারা তাদের আন্দোলনের অংশ করছে না। ফলে গ্রামের কৃষক জনগণ, শহরের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী জনগণ শাহবাগ আন্দোলনকে তাদের স্বার্থরক্ষাকারী আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করতে সমস্যায় পড়ছেন। অধিকন্ত, সরকার ও আওয়ামীলীগ তাদের স্বার্থে এখন শাহবাগ আন্দোলনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে, তাকে ব্যবহার করছে এবং ব্যাপক সংখ্যক জনগণ বিশেষত গ্রামের জনগণ এখন শাহবাগ আন্দোলনকে দেখছেন শহরের স্বচ্ছল মধ্যবিত্তদের আন্দোলন হিসেবে, যা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ও মদদে চালিত হচ্ছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, আন্দোলনে ব্যাপক সংখ্যক জনগণকে সম্পর্কিত করতে না পারলে, শাহবাগ আন্দোলনের ভবিষ্যত আশাপ্রদ হবার কথা নয়। একথা মনে রাখা দরকার যে, মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের  যুদ্ধাপরাধের বিচার আওয়ামীলীগ সরকারের নেতৃত্বে হওয়া সম্ভব নয়। কেননা সংগঠন হিসেবে তারা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকারী নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের দিশারী ও সোনালী সন্তানদের হত্যা ও নির্যাতনকারী।

পাকিস্তান সরকার ‘৭১ সালের ঘটনাবলীর উপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল। তারা বহু ভাষায় অনুবাদ করে এটি বিভিন্ন দেশে প্রচার করেছিল। বাংলা ভাষায়ও এটি প্রচারিত হয়েছিল। শ্বেতপত্রটি পাকিস্তান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। এই শ্বেতপত্রে পাকিস্তান সরকার পূর্ববাংলার ঘটনাবলী ও বিশৃংখল পরিস্থিতির জন্য মাওলানা ভাসানী ও তাঁর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ, সিরাজ সিকদার ও তার নেতৃত্বাধীন পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন (PBSP এর প্রস্তুতি সংগঠন), শেখ মুজিব ও আওয়ামীলীগকে দায়ী করে দালিলিক বক্তব্য উত্থাপন করেছিল। এই সিরাজ সিকদারকে হত্যা করেছে আওয়ামীলীগ। মাওলানা ভাসানীকে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকতে বাধ্য করেছিল তারা। তাহের আজমী, মনিরুজ্জামান তারা সহ প্রায় চল্লিশ হাজার বামপন্থী নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধে যাদের বিপুল অবদান ছিল। এই আওয়ামীগেরই কাঁধে ভর করে কিভাবে যুদ্ধপরাধের বিচার হতে পারে? জামায়াতের মতো তারাও তো যুদ্ধাপরাধী। মুজিব বাহিনী ও পরে রক্ষী বাহিনী গঠন করাই হয়েছিল প্রয়োজনীয় লোকদেরকে হত্যা করে ইতিহাসকে পাল্টে দিতে। কাজেই আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জামায়াত নয়, গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত জনগণের বিপ্লবী সরকারই কেবল যুদ্ধাপরাধের সঠিক ও ন্যায্য বিচার করতে পারবে।

বর্তমানে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে কোনো পক্ষের হাতেই এখন আর লাগাম নেই। আওয়ামী-জামায়াতের আপোষের সম্ভাবনা ভেস্তে গেছে। বিএনপি এখন জামায়াত ও ধর্মীয় দলগুলোর প্রতি আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। শাহবাগ আন্দোলন খেই হারাচ্ছে। দেশ, জাতি, জনগণ দিশাহীনতায় ভূগছেন এবং দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছেন অন্ধকার আশাহীন ভবিষ্যতের দিকে। এর থেকে জনগণ মুক্তি চায়। শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের ঐক্যের ভিত্তিতে একটি অপরাজেয় গণযুদ্ধ গড়ে তুলে স্রাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ-আধিপত্যবাদ নির্ভর ক্ষমতালোভী লুটেরা শাসকশ্রেণিকে হটানোর মধ্য দিয়েই জনগণ কেবলমাত্র তাদের কাঙ্খিত উজ্জ্বল ভবিষ্যত অর্জন করতে পারেন।¡

( মানব রহমান )
     মুখপাত্র
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি ( মাওবাদী বলশেভিক পুনর্গঠন আন্দোলন – MBRM)

Tags: , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: